সৃজনশীলতা এবং স্থায়িত্বকাল-প্লাবন কোরেশী 

সৃজনশীলতা এবং স্থায়িত্বকাল

যে কোনো ভাবেই যে কেউ জনপ্রিয় অথবা ভাইরাল হয়ে যেতে পারে। মানসম্পন্ন অথবা মানহীন, দু’ধরনের সৃষ্টিকর্ম দিয়েই মানুষ জনপ্রিয় হতে পারে। মানুষেরা বুঝে অথবা না বুঝে সে সব সৃষ্টিকর্ম গ্রহণ করেন। গান কিংবা কবিতা, নাটক অথবা সিনেমা, গুঁড়ো মসলা কিংবা ভেজাল সার, যাই হোক না কেনো, সস্তা কিংবা মানহীন প্রোডাক্ট সবসময়ই বেশী চলে।

আপামর জনগোষ্ঠী মানহীন সাহিত্যকে সহজে কাছে টেনে নেয়। মানসম্মত সাহিত্য কিংবা নাটক-সিনেমা অনুধাবন করার ক্ষমতা তাদের থাকে না। এটা তাদের দোষ নয়, এটা হলো অজ্ঞতা। বাজারে চটি বইয়ের যতো কাটতি, রবীন্দ্র রচনাবলীর কাটতিও ততোটা নয়।

বেশিরভাগ মানুষ জ্ঞানার্জনের দিকে ধাবিত হয় না। তারা ধাবিত হয় অর্থের দিকে। ফলে শতকে-শতকে অট্টালিকা তৈরি হয় প্রচুর, পক্ষান্তরে জ্ঞানপিপাসু তৈরি হয়নি বললেই চলে। ভেজাল মসলা, ভেজাল সার বাজারে অনেক বেশি চলে। এটার কারণ, ওসব পণ্য কম দামে পাওয়া যায়। কিন্তু ভেজাল পণ্য ব্যবহারে জীবন অথবা ফসলের দীর্ঘমেয়াদী যে ক্ষতি হবে, ওটা ভাবার সময় মানুষের নেই। মানুষের তাৎক্ষণিক লাভ দরকার, তাৎক্ষণিক শিহরণ দরকার। ফলে ভেজাল তেল, ঘি, ছানা, রসমালাই, গান কিংবা সিনেমা গ্রহণ করতে হবে।

এভাবেই চলে এসেছে, এভাবেই চলছে এবং এভাবেই চলবে, কতোদিন কে জানে? আমরা খেয়াল করেছি, হুট করে অযোগ্য কোন গায়ক-গায়িকা তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। রাতারাতি স্টার হয়ে ওঠা সেইসব সব গায়ক-গায়িকা ছয় মাস কিংবা এক বছর মার্কেট দাপিয়ে বেড়ান আর তারপর ব্যাক টু দ্য প্যাভিলিয়ন।

আমরা অবাক হয়ে ভাবি, আহারে! এত জনপ্রিয় শিল্পী এত তাড়াতাড়ি বিদায় নিলেন? দশকে-দশকে আমরা এরকম অনেক গায়ক-গায়িকা দেখেছি, যারা জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিলেন, আর মাত্র কয়েক বছরেই জনগণ তাদের আস্তাকুড়ে ছুড়ে ফেলেছে। এর কারণ হলো, জনপ্রিয় এসব শিল্পীদের শিল্পের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা ছিলো না।

তারা শিখতে চাননি, তারা নিজেকে গঠন করার কথা ভাবেননি। তারা টাকা কামাই করেছেন। তারা জনপ্রিয়তার স্বাদ নিয়েছেন। তারা সস্তা কথার গান গেয়েছেন, আর অবশেষে একেবারেই হারিয়ে গেছেন। বলা যায়, এটি তাদের প্রাপ্য ছিল। এইসব তথাকথিত জনপ্রিয় শিল্পীরা হারিয়ে যেতে- যেতে এতটাই তলিয়ে যান যে, একটা সময় তাদের নাম গন্ধ পর্যন্ত থাকে না।

রেডিও-টেলিভিশনসহ কোন মাধ্যম কখনো এদের ডাকে না, কথা বলতে দেয় না, কারণ; কথা শোনা বা বলার মতো যোগ্যতা তাদের তৈরি হয়নি। এরকম জনপ্রিয়দের উড়ে এসে জুড়ে বসা শিল্পী পলি আমরা। শিল্পী অত সহজে তৈরি হয় না। শিল্পী হ’তে গেলে শিল্পবোধ লাগে, মানসম্মত কর্ম লাগে। শিল্পীর পড়তে হয়, জানতে হয়, বুঝতে হয়। সকল শিল্পীর এটা মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, সস্তা জনপ্রিয়তাই কেবল শিল্পের উদ্দেশ্য নয়। শিল্প মানুষের জন্য, সমাজের জন্য, পৃথিবীর জন্য। শিল্প প্রজন্ম তৈরি করে, আর সেই প্রজন্মকে পথ দেখায়।

শিল্প রসিকতার বিষয় নয়, শিল্প তামাশার উপাদান নয়। শিল্প জীবনের কথা বলে, শিল্প প্রগতির পথ বাতলে দেয়। মনে রাখা ভালো, শিল্পকে অবজ্ঞা করে শিল্পী হওয়া, কোনদিন কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। আগামিতে যারা গাইতে বা লিখতে আসছেন, তাদেরকে বলছি, সস্তা জনপ্রিয়তার ধান্দা ছাড়ুন, শিল্পসম্মত রূপে নিজেকে তৈরি করুন। প্রচন্ড চটুল আর বাণিজ্যিক গান বা কবিতাকেও শিল্পসম্মত করে তোলার কায়দাটা শিখুন। সর্বদা শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধ থাকুন।

শ্রোতা-দর্শকের কাছে আপনি আপনার যোগ্যতা বুঝিয়ে দিন। আপনার সস্তা কথার গান শুনে যে বাচ্চা ছেলেটা বা মেয়েটা বাহবা দিচ্ছে, একদিন সে বড় হবে, পড়াশোনা করবে। সেদিন সে বুঝে যাবে, আপনি রুচিহীন শিল্পী ছিলেন। এভাবেই প্রজন্ম একদিন আপনাকে নস্যাৎ করে দেবে। মানুষ তো পেছনের সুন্দরগুলোকেই কেবল বুকে আগলে রাখে। ভুলে যাবেন না, যারা হাততালি দিতে জানে, তারা কিন্তু গালিও দিতে জানে।

প্লাবন কোরেশী সংস্কৃতিকর্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *