সাবরিনা সমাচার : প্লাবন কোরেশী

সাবরিনা সমাচার : প্লাবন কোরেশী

মেয়েটির নাম সাবরিনা। ভারী মিষ্টি মেয়ে। কী সুন্দর দেখতে। চোখ ফেরানো যায় না। দেখলেই কেমন আপন-আপন লাগে। মেয়েটার দৃষ্টিজুড়ে খেলা করে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা, মেয়েটার বাহুযুগল যেনো কলমিলতা, মেয়েটার ঘন চুলের বাউলিয়ানা যেনো উত্তাল মেঘদের লুটোপুটি। মেয়েটি আমাদের সন্তান, মেয়েটি আমাদের বোন, মেয়েটি আমাদের প্রেমিকা, মেয়েটি আমাদের মহীয়সী মা-জননী। মেয়েটির অবয়বে লুকিয়ে রয়েছে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি।

আমাদের মেয়েটি দেখতেই যে কেবল সুন্দর, তা নয়। মেয়েটিকে আমরা যোগ্যতাসম্পন্না ক’রে গড়েও তুলেছি। শৈশব-কৈশোরে ভালো স্কুলে পড়িয়েছি, বড় হবার পর তাকে ডাক্তার বানানোর সবরকম আয়োজন করেছি। তাকে ভালো খাবার খেতে দিয়েছি, ভালো জামা-কাপড় পরতে দিয়েছি। মেয়েটিও আমাদের নিরাশ করেনি। পাশের পর পাশ দিয়ে মেয়েটি আজ কার্ডিয়াক সার্জন, যে কী না জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট এর মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কর্মরত।

সাবরিনা সমাচার : প্লাবন কোরেশী

আমাদের এই লক্ষ্মী মেয়েটির হাতে এখন অনেকের স্বপ্ন, অনেকের জীবন। আমরা জানি, ডাক্তারি মহৎ পেশা। আমাদের এই আদুরে মেয়েটির মহত্ত্বম পরশে কত মুমূর্ষু রোগী ফিরে পায় প্রাণশক্তি, কত মৃত্যুপথযাত্রী দেখতে পায় জীবনের আলোকবর্তিকা। এমন মেয়ে সমাজে খুব বেশি তো হয় না। আমরা মনে-মনে খুব খুশি, কারণ; আমাদের মেয়েটি মানুষের মতো মানুষ হয়েছে। আমরা গর্ব করেই বলি- সাবরিনা, আমাদের মেয়ে।

সাবরিনা সমাচার : প্লাবন কোরেশী

কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এতো-এতো বই, এতো-এতো শিক্ষা, এতো-এতো সার্টিফিকেট, এতো-এতো সফলতা, এসবের মাঝখানে আমরা, সাবরিনাদের অভিভাবকেরা ভাবতেই পারি না, আমাদের সাবরিনারা নিরবে-নিভৃতে কীভাবে নষ্ট হয়ে গেছে, কীভাবে পঁচে-গ’লে গেছে তাদের মন, কীভাবে অথৈ সাগরে ডুবে মরেছে তাদের মনুষত্ব। সারা পৃথিবীর মানুষ ম’রে যাচ্ছে, লাখো বছরের অর্জিত সভ্যতায় থাবা দিয়েছে করোনা নামক অপ্রতিরোধ্য এক ভাইরাস।

সাবরিনা সমাচার : প্লাবন কোরেশী

মানুষ এখন ভুলে গেছে গগনবিদারী অট্টালিকা বানাতে, মানুষ আজ স্বপ্ন দেখে না একরে-হেক্টরে জমি কিনতে, প্রাণের মায়ায় মানুষ এখন ভুলেও কামনা করে না প্রিয়জনের মায়াবী চুম্বন। মানুষ এখন কেবল বাঁচতে চায়। মানুষ বুঝে গেছে, জীবনের চাইতে মূল্যবান আসলেই আর কিছু নেই। এ পাড়ায়, ও মহল্লায় কতো মানুষ হারিয়ে যাচ্ছে শেষ কথাটি না ব’লে, কতো আপনজনের লাশটা পর্যন্ত দেখতে যেতে পারছে না অন্যরা, কতো মানুষ চিকিৎসা না পেয়ে নিভৃতেই চ’লে যাচ্ছে জীবনের ওপারে।

এরকম এক নিঠুর সময়ে সাবরিনার মতো কিছু নরপশু টাকা ধরার ফাঁদ পেতেছে। একজন ডাক্তার হয়ে এই বিপদে যেখানে সাধ্যমত মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিত, তা না করে সাবরিনারা ভাবছে, কীভাবে বস্তায়-বস্তায় টাকা কামাই করা যায়। সরল মানুষদের হাতে ভুয়া করোনাসনদ ধরিয়ে দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি-কোটি টাকা। সাবরিনা বা তার দোসররা একবারও ভাবছে না, তাদের জালে জড়িয়ে কতো নিরীহ মানুষের জীবন বিপন্ন হচ্ছে। জেনে বুঝে তারা মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

তারা ভাবছে, তারা অবিনশ্বর। সম্ভবত এই ভেবে তারা আনন্দে রয়েছে, এই পৃথিবী তাদের চিরকালীন আবাসস্থল। সাবরিনা একজন ডাক্তার। শিক্ষিতা মেয়ে। মিষ্টিসুন্দর চেহারা। যে পেশায় সে যোগদান করেছে, অনেকের কাছে এটা সোনার হরিণ। এই চাকরি ক’রে শহরের বুকে ছোট্ট একটা ফ্ল্যাট, একটা গাড়ি, বেশ ভালো মানের খাবার-দাবার, কিংবা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য খানিকটা সঞ্চয় অনায়াসেই করা সম্ভব।

সাবরিনা সমাচার : প্লাবন কোরেশী

সুখে থাকার জন্য এর চেয়ে বেশি আর তো কিছু লাগে না মানুষের। তাহলে এভাবে কেনো বখে যায় আমাদের সাবরিনারা? কেনো তারা মনুষত্বের মাথা খেয়ে আশপাশের সব মানুষকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা ক’রে? কেনো তারা ভুলে যায়, এই মানুষগুলো তাদের মা-ভাই-বোন, এই মানুষগুলোই তাদের বন্ধু বা স্বজন? কেনো তারা মানতে চায় না, মানুষকে মেরে ফেলে মানুষের পৃথিবীতে কেউ ভালো থাকে না? পৃথিবীর পিতামাতাগুলো কতো কষ্টে তাদের সন্তানদের লালন-পালন করেন।

সাবরিনা সমাচার : প্লাবন কোরেশী

নিজে খেয়ে না খেয়ে তাদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠান মানুষের মতো মানুষ ক’রে গড়ে তুলতে। পড়াশোনা শেষ ক’রে সেই সন্তানেরা জজ-ব্যারিস্টার হয়, উকিল-মুক্তার হয়, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হয়। আমরা সাধারন মানুষেরা তাদের হাতে একেকটা সেক্টরের দায়িত্ব তুলে দেই। আমরা তাদের উপর ভরসা করি। আমাদের সেই ভরসার মুখে চুনকালি মেখে সম্ভাবনাময় সন্তানগুলো একা একটা সাবরিনা হয়ে যায়। এই সব সাবরিনারা ন্যায়-নীতির ধার ধারে না, এইসব সাবরিনারা সুন্দরকে পাশ কাটিয়ে চলে, দুর্নীতি আর অসততাকে পুঁজি ক’রে তারা গড়ে তোলে অর্থের পাহাড়। এইসব সাবরিনারা ভুলে যায়, একটা মানুষ এমনকি একটা কাছিমের সমান বয়স পর্যন্ত পায় না।

কালেভদ্রে আমরা দু-একজন সাবরিনার কর্মকান্ড সম্পর্কে অবগত হই। অথচ আমাদের আশেপাশে কতোশতো সাবরিনা ঘাপটি মেরে থাকে, সে হিসেব করবে কে? সাবরিনা গ্রেপ্তার হয়েছে, ভালো কথা। প্রচলিত আইনে তার বিচার হবে, এমনটাই আশা করতে পারি। কিন্তু এই বিচারটি হবে কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ায়, এটাও চিন্তার বিষয়। সাবরিনার কারণে কতো মানুষ তাদের জীবনের ছন্দ হারিয়েছে, কতো মানুষের প্রাণ গিয়েছে, সেই পরিসখ্যান বের করা কঠিন কাজ নয় কি? আরও এরকম কতো-কতো সাবরিনা বা সাবরিনার লালনকর্তারা আমাদের চারপাশে লুকিয়ে আছে, আমরা তা কি করে জানবো? এ-কথা সত্যি, সাবরিনারা জন্ম নেয় এক-একটা সভ্যতাকে তছনছ ক’রে দিতে।

সাবরিনা সমাচার : প্লাবন কোরেশী

সাবরিনারা নিজের স্বার্থ হাসিল করতে গিয়ে সারা পৃথিবীর কাছে নিজের দেশকে ছোট করে দিতেও দ্বিধা করে না, সাবরিনারা মানুষ মারতে দ্বিধা করে না, সাবরিনারা অন্যায় করে সানন্দেচিত্তে। সাবরিনাদের সম্মানের চিন্তা নেই, সাবরিনাদের দেশের প্রতি দায় নেই, সাবরিনাদের মরনের ভয় পর্যন্ত নেই। সাবরিনাদের টাকা দরকার। অনেক অনেক অনেক অনেক অনেক টাকা দরকার। সেই টাকা কোন পথে এলো, তা ভাবার সময় তাদের নেই। বাহারি পোষাক, দামী গাড়ি, আর রঙমহলের উষ্ণ আনন্দে ভেসে তারা ভুলে যায়, মানুষ মানুষের জন্য। এই যে এতো আয়োজন, এই যে এতো প্রয়োজন, এই যে বিলাসিতা, এই যে চাকচিক্য প্রদর্শন, এই যে ক্ষমতার লড়াই-

আচ্ছা, মানুষ বাঁচে ক’দিন??? লেখকঃ প্লাবন কোরেশী সংস্কৃতিকর্মী

 

লেখকঃ প্লাবন কোরেশী সংস্কৃতিকর্মী

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *