দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ায় আন্তরিকভাবে কাজ করতে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ এনএসআই-এর কর্মীদের দেশকে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক ও দুর্নীতিমুক্ত করতে তাঁর সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করায় আন্তরিকভাবে কাজ করে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি চাই এনএসআই’র প্রতিটি সদস্য দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে আপনাদের কর্তব্য পালন করবেন। কর্তব্য পরায়নতা এবং শৃঙ্খলা বজায় রেখেই আপনারা আপনাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব আপনারা পালন করবেন।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ সকালে জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার (এনএসআই) নবনির্মিত বহুতলবিশিষ্ট প্রধান কার্যালয় ভবন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে একথা বলেন। তিনি গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে ভার্চুয়ালি এই ভবন উদ্বোধনে অংশগ্রহণ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতার নেতত্বে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা এদেশ স্বাধীন করেছি। কিন্তু ’৭৫ এর পর মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ থেকে বাংলাদেশকে বিচ্যুত করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আবার আমরা জাতির পিতার সেই আদর্শকে ফিরিয়ে এনেছি। বাংলাদেশ আজকে সারা বিশ্বে একটা মর্যাদা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এই মর্যাদাটা ধরে রাখা একান্তভাবে অপরিহার্য।

তিনি এনএসআই সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, একটা বিষয়ে আপনাদের লক্ষ্য রাখতে হবে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, মাদক, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছি এবং এসব ব্যাপারে আপনাদের সদা সতর্ক থাকতে হবে, যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের জান-মাল রক্ষা করা এবং জনগণের জীবনের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করায় যা যা করণীয় সেটা আপনাদের করতে হবে। এই সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক বা দুর্নীতির হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে, দেশের মানুষকে বাঁচাতে হবে। সেই বিষয়ে অবশ্যই আপনাদের যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে হবে- সেটাই আমি আপনাদেরকে অনুরোধ করবো।

করোনা পরিস্থিতি বাংলাদেশের উন্নয়নে কিছুটা বাধার সৃষ্টি করলেও এই অবস্থা থেকেও বাংলাদেশ উত্তোরণ ঘটাতে পারবে, উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, টিকা দান কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে এবং দেশের মানুষ যাতে নিজেদের আরো সুরক্ষিত করে সেজন্য তাদের মধ্যে আরো সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। তাই, সকলকে একযোগে কাজ করার আমি আহ্বান জানাচ্ছি।

গণভবন প্রান্ত থেকে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব ড. আহমদ কায়কাউস। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল টিএম জোবায়ের।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত ২০০৯ সালে আমরা সরকার গঠন করার পর থেকে এনএসআই এর গুরুত্ব বিবেচনায় এনে অনেক নতুন পদ সৃষ্টি এবং সংস্থার জনবল দ্বিগুণ বৃদ্ধি করেছি। একইভাবে আগের মঞ্জুরীকৃত পদকে দ্বিগুণ করা হয়েছে। এনএসআই সদস্যদের কর্মস্পৃহা ও মনোবল বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০০৯ সালের পরে বিভিন্ন পদে মোট ১৬০১ জনকে পদোন্নতি প্রদান করা হয়েছে, যা ইতিপূর্বে কখনই সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

তাঁর সরকার এ সংস্থার সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠন করেছে উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, বিভিন্ন পদে পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টির জন্য সমন্বিত নিয়োগ বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন পদের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে ও বেতন স্কেল সমন্বয় করা হয়েছে। তিনি বলেন, তাঁর সরকার এনএসআই এর সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য রেশন সুবিধা কার্যকর করেছে। যা আগে নির্দিষ্ট কিছু পদের কর্মচারীদের জন্য নির্ধারিত ছিল। তিনি বলেন, এই সংস্থার জন্য পর্যাপ্ত যানবাহনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে ঝুঁঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে আপনাদের জন্য ৩০ শতাংশ বিশেষ ভাতা মঞ্জুর করেছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনবল ও কর্মপরিধি বৃদ্ধি পেলেও এনএসআই প্রধান কার্যালয়ের জন্য পর্যাপ্ত স্থান সংকুলান ছিল না। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাপ্তরিক কাজ এবং স্পর্শকাতর গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনার স্বার্থে তাঁর সরকার এর প্রধান কার্যালয় ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় এবং তদানুযায়ী তিনি ১৭ জানুয়ারি ২০১৫ তারিখে প্রধান কার্যালয় ভবনের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন।

দেশের বিভিন্ন বিভাগ ও জেলায় এনএসআই এর নিজস্ব ভবন ছিল না উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর সরকার প্রধান কার্যালয় ছাড়াও সকল বিভাগ ও জেলা এনএসআই অফিসের জন্য জমি বরাদ্দের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে নিজস্ব জমিতে ৩টি বিভাগীয় কার্যালয় এবং ২০টি জেলা কার্যালয়ের ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে এবং বর্তমানে ২১টি জেলা কার্যালয় ভবনের নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। অবশিষ্ট জেলাগুলোতে দ্রুত কাজ শুরু হতে যাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন, এতে করে কর্মদক্ষতা বাড়বে, জনগণের নিরাপত্তা বাড়বে এবং গোয়েন্দা কাজের মধ্যদিয়ে যেকোন তথ্য জোগাড় করাও সম্ভব হবে। গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনায় প্রশিক্ষণের গুরুত্ব অপরিসীম উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে প্রশিক্ষণের আধুনিকীকরণ এখন সময়ের দাবি। এ বিষয়টি বিবেচনায় এনে আমরা জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের জন্য ঢাকার ধামরাইয়ে ৯ দশমিক ৫৬ একর জমি বরাদ্দ দিয়েছি।

তিনি বলেন, প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের নতুন জনবল, যানবাহন ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদির অনুমোদন ইতোমধ্যেই দেওয়া হয়েছে। এই প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এর মাধ্যমে এনএসআই সদস্যদের পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদেরকেও নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। বিদেশী বিভিন্ন সংস্থার সদস্যগণও এই প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করবেন এবং তাদের সাথে প্রশিক্ষণলব্ধ তথ্য ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

প্রধানমন্ত্রী এনএসআই সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনাদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও কর্মকান্ডের কারণে দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, ফলশ্রুতিতে দেশে অব্যাহত উন্নয়ন এর পরিবেশ বিরাজমান রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী করোনার প্রথম দফা আগ্রাসনের মত দ্বিতীয় দফাতেও এনএসআই সদস্যদের যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনের এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘নতুন করে দ্বিতীয় দফায় করোনা দেখা দিয়েছে। করোনা মহামারি ব্যবস্থাপনায়ও আপনারা অক্লান্তভাবে কাজ করেছেন। এখন যে অবস্থাটা হয়েছে সেখানেও দায়িত্ব পালন করতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে মন্দাভাব পরিলক্ষিত হলেও বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। অতিমারীর এই সংকট কালেও আমাদের মাথাপিছু আয় বাড়ছে, দারিদ্র্যের হার কমছে এবং বৈদেশিক রিজার্ভের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বলেন, করোনা সংকট মোকাবিলায় সময় উপযোগী যথাযথ সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণেই অর্থনৈতিক উন্নতির এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।

অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হতে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার সুপারিশ লাভ করেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা এই অগ্রযাত্রা বজায় রাখায় গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, তাঁর সরকার ইতোমধ্যে করোনা নিয়ন্ত্রণের জন্য অনেকগুলো নির্দেশনা দিয়ে দিয়েছে। সেই নির্দেশরা যাতে যথাযথভাবে সবাই পালন করে সেদিকে সবাইকে দৃষ্টি দিতে হবে। পাশাপাশি দেশের মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডও যেন সচল থাকে সে বিষয়ে আমরা যথেষ্ট সচেতন। তবে, মানুষের জীবনটা আগে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জীবন যদি না বাঁচে তাহলে অর্থনীতিই বা কি আর রাজনীতিই বা কি। মানুষের জীবন আগে বাঁচাতে হবে। কাজেই স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি করা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং নিয়মনীতি মেনে চলে নিজেকে সুরক্ষিত করা এবং অন্যকে সুরক্ষিত রাখতে হবে এবং সকলে যেন এটা সারাদেশে মানে সেটা নিশ্চিত করায় আপনারা দায়িত্ব পালন করবেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এক যুগ আগের বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশ এক নয়। আজকের বাংলাদেশ এক বদলে যাওয়া বাংলাদেশ। কিন্তু যারা স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি এখনো তারা দেশ, রাষ্ট্র ও জনগণের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।

শেখ হাসিনা বলেন, আমি বলতে চাই, রাজনীতি আর সন্ত্রাসবাদ কখনো এক হতে পারে না। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে, জনগণের জানমাল রক্ষায় যা করা প্রয়োজন সরকার তাই করবেন। আমি এবং আমার সরকার সবসময় আপনাদের পাশে ছিলাম এবং ভবিষ্যতেও থাকবো, ইনশাআল্লাহ। তিনি বলেন, আমরা চাই, ২০৪১ সালের বাংলাদেশ হবে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। জাতির সেই লক্ষ্য পূরণে আপনাদের আরও বেশি কর্মতৎপর হতে হবে। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা বাংলাদেশকে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ পরিণত করবো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *