দানেই পরিতৃপ্তি-আত্মার প্রশান্তি

ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের এক যৌথ গবেষণার ফল প্রকাশিত হয় ২০০৮ সালে। ৬৩০ জনেরও বেশি স্বেচ্ছাসেবক এ গবেষণাটিতে অংশ নেন। প্রথমে তাদেরকে তাদের বার্ষিক আয়ের বিবরণ দিতে বলা হয়। এরপর মাসে তারা যে ব্যয়গুলো করেন, তার বিস্তারিত বিবরণ দিতে বলা হয়। নিজেদের জন্যে ব্যয় ছাড়াও দান, উপহারসহ সব ধরনের ব্যয়েরই বিবরণ দিলেন তারা। এরপর তারা সুখী কিনা, তা যাচাইয়ের জন্যে কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে বলা হলো তাদের।

দেখা গেল, যারা দান করেছেন, অন্যদের উপহার দেবার জন্যে ব্যয় করেছেন, তারা অনেক বেশি সুখী মনে করছেন নিজেকে, তাদের চেয়ে যারা এদের মতো অত দান করেন নি। অন্যকে দেয়ার চেয়ে নিজের জন্যেই বেশি খরচ করেছেন ঐ মানুষগুলো।

এদের মধ্যে ১৬ জন কর্মীকে বেছে নেয়া হলো, যারা একটি কোম্পানিতে কাজ করতেন। এদের প্রত্যেকেই বছর শেষে কোম্পানি বোনাস হিসেবে পেলেন ৩ হাজার থেকে শুরু করে ৮ হাজার ডলার। মজার ব্যাপার হলো, এই বোনাস পেয়ে তারা যত না খুশি হলেন, তারচেয়ে বেশি খুশি হলেন যখন আয়ের একটা অংশ তারা দিয়ে দিলেন সোশাল চ্যারিটি ফান্ডে। এই গবেষণায় দেখা যায়, দানের এই তৃপ্তি আর আনন্দের জন্যে দিনে মাত্র পাঁচ ডলার ব্যয়ও যথেষ্ট হতে পারে।

মানে দান না করে কুক্ষিগত করে রাখলে কী হয়! শুধু নিজের ভোগে ব্যয় করলে! একসময় মনে করা হতো সম্পদই সুখের উৎস। সম্পদ বাড়ালেই বোধ হয় মানুষ সুখী হবে। সম্পদের পেছনে পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটতে গিয়ে গজিয়ে উঠল একের পর এক বস্তুবাদী সমাজ, বস্তুবাদী সভ্যতা।
কিন্তু ভুল ভাঙতে শুরু করল খুব দ্রুতই। দেখা গেল, অঢেল সম্পদ আর সীমাহীন প্রাচুর্য থাকার পরও মানুষ সুখী হতে পারছে না। ২০১৫ সালের এক গ্লোবাল ওয়েল্থ রিপোর্ট অনুযায়ী, পৃথিবীতে ব্যক্তি মালিকানাধীন যে মোট ১৩২ ট্রিলিয়ন সম্পদ আছে, তার ৪২ শতাংশই (৬৩.৫ ট্রিলিয়ন) আছে আমেরিকানদের হাতে। কিন্তু ২০১২ সাল থেকে জাতিসংঘ বিশ্বে সুখী দেশগুলোর যে তালিকা করেছে, তার শীর্ষে এ পর্যন্ত একবারও যেতে পারে নি আমেরিকা।

কারণ মানুষ যখন শুধু নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকে, নিজের জন্যেই সঞ্চয় করে, সে খুব দ্রুত ক্লান্ত আর নিরানন্দ হয়ে পড়ে।

আমাদের জীবনের দুটো দিক। একটি বৈষয়িক, একটি আত্মিক। জীবনে এই দুটোকে মেলাতে হয়, তবেই তা হবে উচ্চতর জীবন। এর কোনো একটা দিক খুব বেশি হলে জীবন একপাশে হেলে পড়ে। পৃথিবীতে আমরা যাদের স্মরণ করি তারা কি বৈষয়িক? না, তারা বৈষয়িক নন। কারণ তারা নেন না, তারা দেন। যিনি দেবেন তিনি বৈষয়িক হবেন কী করে? দুনিয়াদারির প্রয়োজন আছে, যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু। কিন্তু প্রেম, ভালবাসা, স্বার্থহীনতা, অন্যকে দেয়া-এগুলো আরো বেশি ভালো, আরো বেশি প্রয়োজন।

সরকারের দফতরে দফতরে ঘুরে অপরিসীম শ্রমে তিনি সরকারকে দিয়ে এয়ারগান নিষিদ্ধ করিয়েছেন। স্কাউটদের সংগঠিত করে পাখিরক্ষার জন্যে সারাদেশে আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। আনসার-ভিডিপির সাহায্য নিয়ে রাস্তাঘাটে পাখিবিক্রিও কমিয়ে এনেছেন। শুধু তাই নয়, পুরনো ঢাকায় বানরদের ধরে ধরে খাইয়ে দেন সকাল-বিকাল। কেন করছেন তিনি এসব? করছেন প্রাণিদের ভালবাসেন বলে। তাদের জন্যে বেদনা অনুভব করেন বলে কিছু একটা করতে চেয়েছেন।

পৃথিবীতে সেই মানুষই বড় যিনি সত্যিকারভাবে ভালবাসতে জানেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মা-কে ভালবেসেছিলেন, দেশকে ভালবেসেছিলেন, নীতিকে ভালবেসেছিলেন, জাত পাত ভুলে দেশের দুঃখী অসহায় মানুষকে ভালবেসেছিলেন। যে কারণে আমরা তাকে মনে রেখেছি।

বলবেন যে অর্থ দানের জন্যে তো উপার্জন থাকতে হবে। উপার্জন যখন হবার হবে। তার আগ পর্যন্ত যতটুকু আর্থিক ব্যয় করি সেখান থেকেই বাঁচিয়ে দান করতে হবে। হয়তো রিকশায় যেতাম, তা না করে হেঁটে গিয়ে সে টাকাটা দান করতে পারি। আবার ধরুন, আমাদের মধ্যে যাদের যাদের বয়স আঠারো হয়েছে, তাদের যদি শারীরিক সামর্থ্য থাকে, তাহলে আসুন চার মাস পর পর রক্ত দেই। রক্তদানের যে তৃপ্তি তা অপূর্ব। না দেয়া পর্যন্ত অনুভবন করা যায় না।

রক্তদান করতে করতে আরেকটি বড় অর্জন হয়ে যাবে। সেটি হলো-দেয়ার অভ্যাস আয়ত্ব হবে। দেয়ার চর্চা হবে। আসলে রক্ত তো মানুষের নিজের শ্রম, ত্যাগ, সংগ্রাম দিয়ে তৈরি হয় না, নিজের জিনিসও না। মানুষের শরীরে এটা প্রকৃতি থেকেই আসে। এই রক্ত দিতে দিতেই একসময় নিজের কষ্ট দিয়ে, ঘাম দিয়ে, শ্রম দিয়ে, ত্যাগ দিয়ে যা অর্জন তা দেয়ার আগ্রহ সৃষ্টি হবে।

নবীজী (স) মানুষের দুর্দশা লাঘবের চেষ্টারত অবস্থাকে এতেকাফের চেযেও বেশি সওয়াবের বলে উল্লেখ করেছেন। সহীহ হাদীস অনুসারে সমস্ত সৎকর্মই (আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে নিজের ও অন্যের কল্যাণে করা প্রতিটি কাজ) সাদাকা হিসেবে গণ্য হবে।
এর মধ্যে রয়েছে- মা-বাবার আন্তরিক খেদমত,পরিবারের ভরণপোষণ, স্ত্রী/ স্বামী ও সন্তানের সাথে সুন্দর ব্যবহার, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের সাহায্য-সহযোগিতা, এতিম-মিসকীন, বিধবা ও অসহায়ের লালন-পালন, রোগীর সেবা ও তার জন্যে দোয়া করা, অসহায় মানুষকে পরিবেশের বন্দিত্ব থেকে মুক্ত করা, অত্যাচারিতকে সাহায্য করা, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ত্রাণ কাজ, প্রকাশ্যে বা গোপনে অর্থ দান, তৃষিতকে পানি পান করানো, পথ থেকে পথিকের জন্যে ক্ষতিকর প্রতিটি বস্তু অপসারণ, পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, গাছ লাগানো, অধীনস্থদের সাথে মানবিক আচরণ, জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে অর্থ বা শ্রম দিয়ে কাউকে অক্ষর জ্ঞান দান করা, অবিদ্যা নাশে সত্যিকারের জ্ঞানে আলোকিত করা, সমস্যা সমাধানে সৎ পরামর্শ দেয়া, হাসিমুখে সুন্দর কথা বলা, আগে সালাম দেয়া।

এগুলো অনেক ধরনের সৎকর্মের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। আমরা নিজেদের জীবনের সাথে একটু মিলিয়ে দেখি যে, এর কোন কোনটি আমরা করছি বা করব বলে নিয়ত ঠিক করেছি। চাইলে আবারো আমরা দেখে নিতে পারি। দানের দুটো ধরন। একটি : আর্থিক দান। আরেকটি : অনার্থিক দান। আর্থিক দান তো আমরা চেষ্টা করি দিনের শুরুতে দিয়ে দেয়ার। আর অনার্থিক যে দান, উপরের যে তালিকাটি দেয়া আছে, এগুলো তো আছেই। সেইসাথে হাঁটতে চলতে ফিরতে যখন যেখানে সৃষ্টির জন্যে, তা মানুষ হোক, গাছ হোক বা পশুপাখি হোক, যতটুকু করা যায় আমরা যেন করি। আসলে কোন দান যে প্রভুর কাছে কবুল হবে এবং সেই দান আমাদের পরিত্রাণের উসিলা হবে তা প্রভুই ভালো জানেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *