জন্মশতবর্ষে বঙ্গবন্ধু- আনিসুজ্জামান

এ আমাদের অশেষ সৌভাগ্য আমরা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন করতে পারছি। তাকে আমরা প্রতি বছরেই স্মরণ করব, কিন্তু সব জন্মশতবর্ষ হবে না। এবারের তার জয়ন্তী বিশেষ তাত্পর্য বহন করে আসছে। আমরা বঙ্গবন্ধুর অর্জন স্মরণ করব, তিনি যখন বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেননি, তখনকার কথাও মনে রাখতে চাইব। মহিরুহ তো মাটি ভেদ করেই মাথা তুলে দাঁড়ায়। শেখ মুজিবুর রহমান রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ১৯৩৯ সালে ১৯ বছর বয়সে। তখন তিনি মুসলিম লীগের এবং সেই সূত্রে মুসলিম ছাত্র লীগের একজন সাধারণ কর্মী। পাকিস্তান দাবির ঘোর সমর্থক হলেও তার মনের গঠনটা ছিল অসাম্প্রদায়িক। সমাজে সাম্প্রদায়িকতা ও ছুঁতমার্গের প্রকাশ তাকে ক্ষুব্ধ করলেও সাম্প্রদায়িকতা থেকে তিনি আত্মরক্ষা করতে শিখেছিলেন সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাসিমের উপদলভুক্ত হওয়ায় তিনি অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং একটি ন্যায়পর সমাজগঠনের চিন্তা নিজের মধ্যে লালন করতে পেরেছিলেন। দেশ ভাগের পরে যখন তিনি তার ক্ষেত্র কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে পূর্ব বাংলার মুসিলম লীগ নেতাদের দুর্ব্যবহার সত্ত্বেও মুসলিম লীগবিরোধী কোনো কাজ করতে প্রথমটায় তার মন সায় দেয়নি। তাই গণতান্ত্রিক যুবলীগ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে গোড়ায় উত্সাহী হলেও শেষ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধাচারণই করেছিলেন তিনি।

মুসলিম লীগের কুশাসন এবং রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে তাদের কৃত অন্যায় এই শেখ মুজিবকেই তাদের বিরোধী করে তুলল। সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠন ছেড়ে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকায় তার সূচনা, কারাবন্দি অবস্থায় আওয়ামী মুসলিম লীগের যুগ্ম সম্পাদক পদে নির্বাচিত হওয়ায় তার এক ধরনের পরিণতি। যে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন মুসলিম লীগের একটা প্রধান দাবি ছিল, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরে মুসলিম লীগ তার কথা ভুলেই গেল।

শেখ মুজিব এ দাবিটাকেই নিজের রাজনীতিতে প্রাধান্য দিলেন। দ্বিতীয় বিষয়টি ছিল রাজনীতিতে ধর্মের ভূমিকা নিয়ে। জিন্নাহ যা-ই বলে থাকুক না কেন, তার উত্তরাধিকারীরা ধর্মকে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রীয় জীবনের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে চাইলেন। শেখ মুজিব প্রথমাবধি চাইলেন ধর্ম ও রাষ্ট্রের ক্ষেত্র পৃথক রাখতে। ১৯৫৫ সালে ছাত্র লীগ ও আওয়ামী লীগের নাম থেকে মুসলিম কথাটা বিলোপ করতে তিনি যেমন সক্রিয় ছিলেন, পাকিস্তানের প্রথম শাসনতন্ত্র রচনার সময়ে গণপরিষদে তেমনি তিনি স্পষ্ট করেই পাকিস্তানকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ঘোষণার বিরোধিতা করেন। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের বিধান রাখার ওপরে জোর দেন এবং পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের নাম পূর্ব বাংলা রাখার দাবি জানান। তত দিনে মুজিব একজন নেতা বলে পরিগণিত

হয়েছেন—১৯৫৩ সালেই তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক—যদিও তার মাথার ওপরে মওলানা ভাসানী ও সোহওয়ার্দীর মতো বড়ো নেতা আছেন। ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে গিয়ে ভাসানী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন করেন এবং ১৯৬৩ সালে সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু হয়। তখন মুনির তার দলে সর্বেসর্বা। ১৯৬০ থেকে ১৯৬২ সালের মধ্যে তার পৃষ্ঠপোষকতায় ছাত্র লীগের কয়েকজন নেতা পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে একটি বিপ্লবী পরিষদ গঠন করেন এবং তার সম্মতি ও সমর্থনে আরো কয়েকজন ছাত্রনেতা স্বাধীন ও সমাজতান্ত্রিক, পূর্ব বাংলা গঠনের লক্ষ্যে সশস্ত্র সংগ্রামের পরিকল্পনা করে নিউক্লিয়াস নামে একটি গোপন সংস্থা গঠন করেন বলেও দাবি করা হয়েছে।

তবে আমরা জানি, প্রকাশ্যে শেখ মুজিব ছয় দফা কর্মসূচি উপস্থাপন করেন ১৯৬৬ সালে। সেই থেকে এই ছয় দফা আদায়ই হয় তার রাজনৈতিক জীবনের মূল লক্ষ্য। বারবার তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়, এমনকি, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় এক নম্বর আসামি করেও ক্ষমতাসীনরা তাকে লক্ষ্যচুত করতে পারেনি। তিনি মৃত্যুবরণ করতেও প্রস্তুত ছিলেন। দেশের মানুষ তা উপলব্ধি করেছিল বলেই আরো প্রবীণ রাজনীতিবিদ থাকা সত্ত্বেও শেখ মুজিবই হয়ে উঠেছিলেন তাদের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু। তাই ১৯৭০-এর নির্বাচনে মানুষ এমন করে দাঁড়িয়েছিল তার সমর্থনে, তাই তার অঙ্গুলিহেলনে ১৯৭১-এর মার্চে অমন একটা শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলন পরিচালিত হতে পেরেছিল। বস্তুত মাটিন লুথার কিং ও নেলসন ম্যান্ডেলার পরে বঙ্গবন্ধুই পৃথিবীর একমাত্র রাজনীতিবিদ, যিনি অসহযোগ আন্দোলনকে সার্থকভাবে রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করেছিলেন।

তার পর তার ৭ মার্চের বক্তৃতা—মানুষের ইতিহাসে এক স্মরণীয় বক্তৃতা। এই ভাষণের যত রকম ব্যাখ্যাই হোক না কেন, এর মর্মকথা প্রকাশ পেয়েছিল হূদয় নিংড়ানো দুটি বাক্যে ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। শত্রু-মিত্র কেউই এর তাত্পর্য বুঝতে ভুল করেনি। সময় যখন এসেছিল, দেশের মানুষ সর্বস্ব পণ করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তিযুদ্ধে। দৃশ্যপটে বঙ্গবন্ধু অনুপস্থিত। তবু তার নামেই যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে। নয়নসমুখে তিনি ছিলেন না। তবু প্রতি মুহূর্তে আমরা তার অস্তিত্ব উপলব্ধি করেছি। তার উপস্থিতি অনুভব করেনি। তারপর বীরের বেশে তিনি এলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিলেন। পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন হলো, এক বছরের মধ্যে একটা গণতান্ত্রিক সংবিধান উপহার দিলেন, ষোলো মাসের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে যোগদান, বাংলাদেশের জন্য অন্যান্য দেশের সঙ্গে পাকিস্তানের স্বীকৃতি আদায়, ইসলামি সম্মেলন সংস্থার সদস্য পদ লাভ, জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভ এবং সেখানে বাংলায় ভাষণ দান— এসবই তার অর্জন। দেশের মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর অবিচলিত আস্থা ছিল। এই আস্থার সুযোগ নিয়ে দেশদ্রোহী ঘাতকেরা তাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে—তার পরিবারের সব উপস্থিত সদস্যসহ। শুধু তার হত্যাকাণ্ড নয়, যেভাবে তার দাফন হয়, তা-ও ছিল জাতির পক্ষে কলঙ্কজনক। কিন্তু সেখানেই বঙ্গবন্ধুর শেষ নয়। টুঙ্গিপাড়ার সমাধি থেকে বেরিয়ে এসে তিনি পরিব্যাপ্ত হয়ে রয়েছেন সারা বাংলাদেশে। যে বাংলাদেশে তিনি স্থপতি, সে বাংলাদেশের বস্তুগত অর্জনের প্রশংসা আজ পৃথিবীব্যাপী ধ্বনিত।

তবু আমাদের আরো অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে; তবেই হবে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার প্রতিষ্ঠা। তার সোনার বাংলা অর্থবৈষম্যহীন ও শোষণহীন সমাজ-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যেখানে সব মানুষের সমান অধিকার, জনগণ যেখানে রাষ্ট্রের মালিক। সেই জায়গাটায় আমাদের পৌঁছতে হবে। আর সেই যাত্রাপথে তার জীবনের দৃষ্টান্ত প্রতি মুহূর্তে আমাদের প্রেরণা দেবে।
লেখক : জাতীয় অধ্যাপক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *