করোনাভাইরাসের টিকা দ্রুত পেতে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে বাংলাদেশ

টিকা

সম্প্রতি ভারতে করোনাভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণ দেখা দেয়ায় প্রতিবেশী দেশ থেকে টিকার সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, বাংলাদেশ টিকা দ্রুত পেতে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে । এ লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া এবং ভারত থেকে টিকা আনার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। ধনী দেশগুলো সিংহভাগ টিকা নিয়ে নেয়ায় গোটা বিশ্বের গরিব দেশগুলো সংকটে পড়েছে।

ফলে সরকার প্রথম ডোজের টিকা দেয়া আপাতত বন্ধ রেখেছে। তবে চীন ও রাশিয়া বাংলাদেশকে টিকা দেয়ার প্রস্তাব করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত থেকে টিকা সংগ্রহের প্রস্তাবে সায় দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সবুজ সংকেত পেয়ে সক্রিয় হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে টিকা পেতে প্রক্রিয়াগত কাজ সম্পাদনে ২ সপ্তাহ সময় লেগে যেতে পারে।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডোজ টিকা কেনার জন্য রাশিয়াকে প্রস্তাব দিয়েছে। রাশিয় ৬০টি দেশে তাদের টিকা বিক্রি করছে। এ কারণে বাংলাদেশের চাহিদা পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি।

মাসে ১০ লাখ টিকা বিক্রির পাশাপাশি তারা বাংলাদেশকে টিকার ফর্মুলা দিতে চেয়েছে। বাংলাদেশ অবশ্য ফর্মুলা দেয়ার পাশাপাশি টিকা উৎপাদনে রাশিয়ার কাছে ঋণ চেয়েছিল। ঋণ দিতে তারা রাজি হয়নি। এখন বাংলাদেশি কোম্পানি রুশ ফর্মুলা থেকে টিকা উৎপাদনে সক্ষম কিনা সেটি যাচাই করে দেখা হচ্ছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, চীন থেকে পাঁচ লাখ ডোজ টিকা উপহার হিসাবে পাওয়া যাবে। তার পাশাপাশি চীন থেকে কিছু টিকা কেনা হবে। টিকা কীভাবে নেয়া হবে সেটা নিয়ে চীনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা হবে। সরকার এরিমধ্যে ‘ইমার্জেন্সি ইউজ অথরাইজেশন’ নীতির ভিত্তিতে রাশিয়ার টিকা গ্রহণের অনুমোদন দিয়েছে। চীনের টিকার বিষয়েও একই প্রক্রিয়ায় অনুমোদন দেয়া হতে পারে।

উভয় টিকার বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দর ঠিক করাসহ অপরাপর বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করবে। চীন ও রাশিয়া সরকারি পর্যায়ে (গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট-জিটুজি) পদ্ধতিতে টিকা বিক্রি করতে আগ্রহী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ছয় কোটি ডোজ অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা উদ্বৃত্ত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র নিজেরা উদ্ভাবনের পর অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা রয়ে গেছে। বাংলাদেশ সরকার এসব উদ্বৃত্ত টিকা সংগ্রহে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের যেসব মানুষ প্রথম ডোজের টিকা দিয়ে দ্বিতীয় ডোজের জন্য বসে আছেন; তাদের জন্য জরুরিভিত্তিতে টিকা দিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে।

সূত্রটি আরও জানায়, ‘বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে টিকা উপহার হিসাবে চায়নি; কিনতে চেয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অনুরোধে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বাণিজ্যিক ও উপহার উভয় পদ্ধতিতে টিকা পাওয়া যাবে।’ এছাড়াও, ভারতে টিকার ব্যাপক চাহিদা সত্ত্বেও তাৎক্ষণিকভাবে ৩০ লাখ ডোজ জরুরি টিকার সরবরাহ পাওয়া যায় কিনা সে বিষয়ে কূটনৈতিক চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন বলেছেন, ‘আমাদের দেশে টিকার সরবরাহকারী ছিল মূলত ভারত। ভারত টিকার সরবরাহ দেরি করে এখন বন্ধ করে দিয়েছে। ভারত বন্ধ করায় আমাদের টিকার সরবরাহের প্রয়োজন হয়েছে। আমরা বলেছি, চীন যেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব টিকা সরবরাহ করে। চীন এ ব্যাপারে আমাদের সঙ্গে কাজ করবে।’

পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেছেন, সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করে দুই সপ্তাহের আগে টিকা পাওয়া সম্ভব নয়।

কোভিড নিয়ে চীন-দক্ষিণ এশিয়া সম্মেলন : এদিকে, কোভিড মোকাবিলা এবং কোভিড পরবর্তী জরুরি চাহিদা পূরণে চীনের উদ্যোগে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে এক ভার্চুয়াল সম্মেলনে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে দক্ষিণ এশিয়ার বড় দেশ ভারত অংশ নেয়নি। তবে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলংকা অংশ নিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। তবে ভারতকেও এ প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে চীন। এ বিষয়ে ভারতের কোনো প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি।

ভার্চুয়াল সম্মেলনের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন সাংবাদিকদের বলেন, কোভিডের কারণে বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন ঝামেলায় আছে। চীন কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছে। একটি হলো, দক্ষিণ এশিয়া এবং চীন কোভিড ইমার্জেন্সি মেডিকেল ফ্যাসিলিটি করবে।

তাছাড়া, তারা আরও তিনটি উদ্যোগ নিয়েছে। একটি হচ্ছে, কোভিড পরবর্তী দারিদ্র্যবিমোচন। কোভিডের কারণে দেশে দেশে দারিদ্র্য বাড়ছে। কীভাবে দারিদ্র্য আর না বাড়ে সে ব্যাপারে তারা তাদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে চায়। সেই লক্ষ্যে কোভিড পরবর্তী দারিদ্র্যবিমোচন কেন্দ্র করতে চায়। তারা বলছে, ই-কমার্স ফোরাম করতে চায় যাতে গ্রামীণ এলাকার দারিদ্র্যবিমোচন হয়। তারা যাতে পণ্যের বিক্রি বাড়াতে পারে। ইদানীং সামনাসামনি ব্যবসা-বাণিজ্য নেই; তাই তারা ই-কমার্স প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিপণন বাড়ানোর অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে চায়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন আরও বলেন, আমরা ছয় দেশ বহুপক্ষীয় ব্যবস্থায় বিশ্বাস করি। কোভিডের সময়ে এক দেশ আরেক দেশের সঙ্গে সহযোগিতা ও অংশীদারিত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এটার ওপর জোর দিয়েছি। এগুলোই মৌলিক বিষয় যা নিয়ে আমরা আলাপ করেছি। এর আগে আমাদের পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে চীনের উপমন্ত্রীর আলাপ হয়েছে। আমরা একটা জিনিস বলেছি, আমরা বাংলাদেশের মানুষের মঙ্গলের জন্য যা যা প্রয়োজন সব করব। এ কারণে এ ফোরাম ছাড়াও আমরা সার্কের নিয়ন্ত্রণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী গত বছরের মার্চ মাসে কোভিড ফান্ড তৈরি করেন, আমরা তাতে শরিক হই। আমরা তার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজও করি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা রোহিঙ্গার কথা বলেছি। রোহিঙ্গা নিয়ে ত্রিপক্ষীয় মিটিং ভালোই ছিল। হঠাৎ সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণে বন্ধ হয়েছে। এটা যাতে আবার তাড়াতাড়ি চালু করা যায়। চীন এ ব্যাপারে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *