প্লাবন কোরেশী’র কলাম- করোনাকালের ঈদ

 

করোনাঝুঁকি মাথায় নিয়েই পালিত হচ্ছে এবারের ঈদ-উল ফিতর। ঈদ কিংবা পূজো ধর্মীয় বিধান হলেও বাঙালির জীবনে এসব আসে উৎসবের আমেজ নিয়ে। এসময় মার্কেট কিংবা বিপণিবিতানে মানুষের উপচে পড়া ভিড় থাকে । সারাবছর যেমনি কাটুক, ঈদে আর পূজোয় নতুন জামা-জুতো কেনা বাঙালির অভ্যাসে পরিণত হয়েছে বলা যায়। কিন্তু এবার, এই ঈদে, কেমন যেন নিস্তব্ধ হয়ে আছে চারপাশ। হবারই কথা, কারণ; মৃত্যুকে সামনে রেখে আর যাই হোক, আনন্দ তো চলে না। সবগুলো বড় মার্কেট বন্ধ হয়ে আছে। আর খোলা থাকলেই বা কী হতো? যেখানে জীবনের নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ,

সেখানে হল্লা ক’রে ঈদ মার্কেটে যাওয়া তো আকাশ-কুসুম কল্পনা। তারপরও যারা স্বাবলম্বী, বিপণিবিতান বন্ধ থাকায়, কিংবা লকডাউনের কারণে তারাও বের হতে পারছেন না। শুধু আমাদের নয়, পুরো পৃথিবীর জন্যই এটা দহনকাল। এরকম বাজে সময় পৃথিবীর কোনো মানুষই দেখতে চায়নি কোনোদিন। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো মানুষের চাওয়া না চাওয়ার উপর নির্ভর করে না। করোনাতান্ডবে মন ভার ক’রে আছে পৃথিবী। আমরাও ভালো নেই।

এমন বিপন্ন সময়ে কেউ ভালো থাকে না। তারপরও আমার আজকের লেখায় নিরানন্দ এই ঈদের কিছু ইতিবাচক দিক তুলে ধরবো। বেশিরভাগ মানুষ, যারা ঈদ কিংবা পূজো বলতে কেনাকাটা বোঝেন, আর পরিবারকে ফেলে দেন চাপের মধ্যে, তাদের দ্বারা পরিবারপ্রধানের অপমানিত হবার সম্ভাবনা এবার একেবারেই নেই। আমি দেখেছি বেয়ারা ছেলেমেয়েগুলো ঈদ বা পুজো এলে তাদের অভিভাবকদের কীরকম চাপের মধ্যে রাখেন।

যে বাবাটার পাঁচ হাজার টাকা খরচ করার যোগ্যতা রয়েছে, তাকে চাপ দেওয়া হয় বিশ হাজার টাকা খরচ করতে। একটা জেনারেশন ঈদের খরচ ঠিকমতো না পেলে ঝগড়াঝাটি, এমনকি ঘরে ভাঙচুর পর্যন্ত করেন। পরিবারের অবস্থা যাই থাক, ওই প্রজন্ম গায়ের জোরে নিজের চাহিদাপত্র পেশ করেন আর পিতামাতারা সেসব দিতে বাধ্য থাকেন। এটা কখনো-কখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায়, ঈদের সব আনন্দই তখন ম্লান হয়ে ওঠে। অনেক ছেলে-মেয়েকে আমি ঈদের আগের দিন বাড়ি থেকে চলে যেতে দেখেছি। ছেলে-মেয়ের অপমান সহ্য করতে না পেরে অনেক বাবা-মাকে আমি কাঁদতে দেখেছি। অনেক স্ত্রীর হাতে স্বামী কে লাঞ্ছিত হতে দেখেছি। পাশের বাসার ভাবীর মতো জামা-কাপড় না পেলে রাগ ক’রে বাপের বাড়ি চলে যেতেও দেখেছি।

আবার কুরবানির ঈদে কে কত বড় গরু কুরবানি দেবে, সেই প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠেন একদল মানুষ। লোক দেখানো কোরবানি দিতে গিয়ে পরের মাসগুলোতে বাসা ভাড়া দিতে না পারা লোকের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। ধর্মীয় রীতিনীতি ভুলে আভিজাত্য প্রদর্শনের এই নোংরা রীতি থেকে মানুষ এবার অন্তত মুক্তি পাবে। ঈদ এলে সকল মানুষের গ্রামের বাড়ি ফেরার একটা তাড়া থাকে। এসময় বাসে কিংবা ট্রেনে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করার কারণে মৃত্যু ঝুঁকি বেড়ে যায় অনেক। প্রতিটি ঈদে অনাকাঙ্ক্ষিত রোড এক্সিডেন্ট আমাদের ঈদের সকল আনন্দকে নস্যাৎ ক’রে দেয়। এবার চলাচলে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, বন্ধ রয়েছে দূরপাল্লার যানবাহন। ফলে এ ধরণের মৃত্যুঝুঁকি এবার নেই বললেই চলে। যে যেখানে আছেন যাতায়াতগত মৃত্যুর হাত থেকে এবার তারা রক্ষা পাবেন।

এবারের ঈদে হয়তো অনেকের পাশেই পরিবার থাকবে না। যে ছেলেটি বা মেয়েটি শহরে থাকে, তার হয়তো গ্রামে ফেরা হবে না। এই সাময়িক বিরহ কষ্ট ডেকে আনবে জানি। এখানে আনন্দের বিষয় হলো, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কোথাও ভ্রমণ বা গমন তো করতে হবে না। কঠিন এক সময় পার করছি আমরা। ঘরের বাইরে থাবা মেলে বসে আছে করোনাভাইরাস। আমরা আতঙ্কিত আমাদের জীবন নিয়ে। প্রায় প্রতিদিন খবর আসছে আমাদের পাশের কোনো বন্ধু বা স্বজন করোনাক্রান্ত, অনেকের মৃত্যুসংবাদও পাচ্ছি প্রতিনিয়ত। এটা আমাদের দহনকাল, এটা উল্লাস নয়, সচেতন থাকার কাল। আমাদের সচেতনতা আর ঘরে থাকার মধ্য দিয়ে এবারের ঈদ শেষ হয়ে যাক। আমরা বেঁচে থাকলে আবারো ঈদ আসবে, আসবে বাঁধভাঙা আনন্দ। সেই সুন্দর দিনের আশায় সবাইকে ঈদ মোবারক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *