একাত্তরের সেই কালো রাত

পাকিস্তান সামরিকবাহিনী বাংলাদেশে গণহত্যার নীল নকশা খ্যাত ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে বাঙালিকে চূড়ান্ত আক্রমণের সময় ২৫ মার্চ দিবাগত রাত ১টা নির্ধারণ করে। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর লে. জে. টিক্কা খান, সেনাপতি মে. জে. খাদিম হোসেন রাজা ও মে. জে. রাও ফরমান আলীর সমন্বয়ে অপারেশন সার্চলাইটের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। 

এই পরিকল্পনায় বাংলাদেশের জনগণের ওপর আক্রমণের ক্ষেত্রে কয়েকটি কৌশল ব্যবহূত হয়—যেমন ক্ষমতা-বহির্ভূত শক্তি প্রদর্শন, আকস্মিক আক্রমণ, চূড়ান্ত প্রতারণা, ত্বরিত্ সাফল্য ও অধিক সন্ত্রাস।

বাংলাদেশে এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের লক্ষ্যস্থল ছিল পিলখানা, রাজারবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিক্ষক ও কর্মচারীদের আবাসস্থল, বিশেষত ইকবাল ও জগন্নাথ হল, ছিন্নমূল ও হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকা, অসমসাহসী বাংলা ও ইংরেজি সংবাদপত্র ‘ইত্তেফাক’ ও ‘পিপল’-এর কার্যালয়। অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে ব্যাপক বাঙালি নিধনযজ্ঞ সংঘটিত হলেও প্রকৃতার্থে আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মী, স্বেচ্ছাসেবক ও সমর্থকবৃন্দ; সেনাবাহিনী, পুলিশ, ইপিআর ও আনসার বাহিনীর বাঙালি অংশ; বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়; তরুণ ছাত্র ও যুবক এবং শ্রমজীবী ও গ্রামীণ জনগণই ছিল মুখ্য।

মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের বিভিন্ন পরিসংখ্যান রয়েছে। সুইডেনভিত্তিক একটি গবেষণা-প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী, ২৫ মার্চ রাতে শুধু ঢাকা শহরের ৭,০০০ এবং পরবর্তী এক সপ্তাহে ৩০,০০০ বাঙালি পাকিস্তানবাহিনীর হাতে নিহত হন। সম্প্রতি ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির এক হিসাব মতে, ২৫ থেকে ২৭ মার্চ দুপুরে কেবল ঢাকায় ২৩-২৪ হাজার বাঙালি পাকিস্তানবাহিনীর আক্রমণে মারা যায়।

মুক্তিযুদ্ধকালে নাত্সীবাহিনীর মতো পাকিস্তান সেনাবাহিনীও অবাঙালি ও হিন্দুকে নিচু জাত ও বিশ্বাসঘাতক রূপে বিবেচনা করত। ইয়াহিয়া খানের দম্ভোক্তিই তার প্রমাণ। তিনি বলেন যে, ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যা করলেই অবশিষ্টরা তাঁদের নিয়ন্ত্রণে আসবে। এমনকি আর. জে. রুমেলের Death by Government গ্রন্থে প্রদত্ত জেনারেল নিয়াজীর বক্তব্য থেকেও বাংলাদেশে গণহত্যা পরিকল্পনাকারীদের ভাবনা প্রকাশ পায়। নিয়াজী বলেন, ‘বাঙালির হিন্দু অংশ নাত্সীর ইহুদির মতো দুর্বৃত্ত, এদেরকে নির্মূল করা উচিত।…পাকিস্তান সামরিকবাহিনী ইচ্ছেমতো বাঙালি নিধন করতে পারবে। কারো কাছে জবাবদিহি নয়। এটাই ক্ষমতার ঔদ্ধত্য।’

বাংলাদেশে পাকিস্তানবাহিনীর এরূপ নারকীয় হত্যাযজ্ঞ বাঙালির চূড়ান্ত বিজয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের জয়ের পূর্বক্ষণেও নিয়াজী ও ফরমান আলীর নির্দেশে এদেশীয় দোসরদের সহায়তায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যায় লিপ্ত ছিল। যার একটি ১৪ ডিসেম্বর বাঙালি বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশব্যাপী গণহত্যা সংঘটনে ‘পোড়া মাটির নীতি’ অর্থাত্ দেশটির সর্বত্র লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ-উত্তর হত্যা সম্পন্ন করে। এরূপ গণহত্যার বিপরীতে বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানের প্রশিক্ষিত, সুসংগঠিত ও অত্যাধুনিক সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মুজিবনগর সরকার ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায় গেরিলা যুদ্ধ ও সশস্র সংগ্রামের মাধ্যমে বিজয় অর্জন করে। যার ফল বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *