এই যে ভাই, আপনিও কিন্তু একদিন ম’রে যাবেন

প্লাবন কোরেশী’র মত ও মতান্তর

                  প্লাবন কোরেশী

সারা পৃথিবীর জনজীবন বিপন্ন করে তুলেছে করোনাভাইরাস। পৃথিবীর প্রায় সকল রাজপথ বন্ধ হয়ে গেছে। সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঝুলছে তালা। সকল বিমানবন্দরে শুনশান নীরবতা।সবকিছু ভুলে মানুষ এখন বাঁচার আকুতি করছে রাত দিন।

এরকম মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও মানুষ মানুষের অনিষ্ট চাইতে পারে? ভাবতে পারে আপন স্বার্থের কথা? হ্যাঁ পারে, খুব ভালোভাবেই পারে। সারা পৃথিবীতে কেউ না পারলেও আমাদের দেশের কিছু মানুষ দেখিয়ে দিয়েছে, তারা কতোটা স্বার্থপর হতে পারে, কতোটা নিচে নেমে তারা খিলখিল করে হাসতে পারে।

মানুষের মাঝে মানুষের পরিচয়ে কতোটা নির্লজ্জের মতো বেঁচে থাকা যায়, কিছু অমানুষ ইতিহাসের পাতায় তা লিখে দিয়েছে, এখানে, এই বাংলাদেশে। অলি-গলি, বাজার-ঘাট, দোকান কিংবা শপিং মল, সব জায়গা ভ’রে গেছে নকল স্যানিটাইজারে। নামিদামি কোম্পানির লোগো কিংবা ব্রান্ড নেইম কিঞ্চিৎ বদল ক’রে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে স্যানিটাইজার নামক এক প্রকার ভয়ঙ্কর রাসায়নিক।

দেখতে প্রায় একই রকম, কিন্তু মূলে নকল এসব স্যানিটাইজার ব্যবহারের ফলে ত্বকের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। এসব সেনিটাইজারে জীবাণুনাশ তো হবেই না, উল্টো মানবশরীরে এগুলো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। সরল বিশ্বাসে যারা এসব স্যানিটাইজার কিনছেন, তারা বুঝতেই পারছেন না, টাকা দিয়ে তারা মরণকে আরো কাছাকাছি ডাকছেন। অথচ বৈশ্বিক এই মহামারিতে কষ্ট সহ্য করে হলেও মানুষকে মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিত। সকলের ভাবা উচিত, কীভাবে একটা জীবন বেঁচে যেতে পারে।

হাসপাতালে ব্যবহৃত মাস্ক ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে আবার তা বাজারজাত করছে একশ্রেণীর ব্যবসায়ী। কি ঘৃণ্য, কি জঘন্য অর্থ উপার্জনের এই কৌশল। দুষিত এসব মাস্ক ব্যবহারের ফলে ব্যাপক হুমকির মুখে পড়তে পারে জনস্বাস্থ্য। মৃত্যুর আঙিনায় দাঁড়িয়ে এরকম নিকৃষ্ট ব্যবসার চিন্তা সুস্থ-স্বাভাবিক কোনো মানুষের মাথায় আসতে পারে না।

নৈতিকতা থেকে কতোটা দূরে সরে গেলে তারপর এতোটা বিবেকহীন হয় মানুষ, এসব ঘটনা তার প্রমাণ বহন করবে আজীবন। বিশ্বের বড়-বড় বিজ্ঞানী আর মেডিসিন বিশেষজ্ঞরা যখন করোনাভাইরাস এর স্থায়ী কোন ভ্যাকসিন বা টিকা এখনো আবিষ্কার করতে পারেননি। সেখানে আড়ালে-আবডালে অলিতে-গলিতে করোনা ভাইরাসের বিভিন্ন রকম ঔষধ বিক্রি হচ্ছে দেদারছে। ভন্ড ফকিরদের তাবিজ-কবজও থেমে নেই। কিছুদিন আগে থানকুনি পাতাও বিক্রি হয়েছে চড়া দামে। বাজারে রটিয়ে দেয়া হয়েছে, এই পাতা করোনাপ্রতিরোধী।

একশ্রেণীর মানুষ কিছু না জেনেই এসব ওষুধ বা লতাপাতা কিনছেন। তারা বুঝতেই পারছেন না, এইসব ঔষধে করোনা উপশম তো হবেই না, বরং এগুলো তাদেরকে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলতে পারে। ঘি অথবা পনির, দুধ কিংবা মিষ্টি, চাল-ডাল-গুঁড়া মসলা, সবখানে ভেজালের কারবার। ওজন বাড়ানোর জন্য চিংড়ি মাছের মাথার ভেতর সিরিঞ্জ দিয়ে পুশ করা হচ্ছে জেলি। বড় মাছের পেটের ভিতর ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে লোহা না হয় ভারী কোন বস্তু, কারণ; এতে ওজন বাড়ে। মানুষ ন্যায্য লাভ চায় না। অন্যায় ক’রে হলেও মানুষের অনেক-অনেক-অনেক লাভ দরকার। মানুষের টাকার পাহাড়ে ওঠা দরকার।

মানুষ ভাবছে, অনন্তকালের জন্য তারা পৃথিবীতে এসেছে। এরকম দুর্দিনে মানুষের জীবন নিয়ে যারা খেলছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা উচিত। সে শাস্তিটা এমন হবে, যা দেখে অনেক অপরাধী অপরাধ করার কথা ভুলে যাবে। কতো লোক রোড এক্সিডেন্টে মারা যায়, কতো মানুষ মরে ক্রসফায়ারে, ভেজাল পণ্য বাজারে দিয়ে যারা মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে, যারা মানুষকে মৃত্যুর মুখোমুখি নিয়ে যাচ্ছে কিংবা মেরে ফেলছে, তারাও অপরাধী, তারাও খুনি। দরকার হলে এরকম দু’দশটাকে তাদের তৈরি স্যানিটাইজারের ড্রামে চুরিয়ে মারতে হবে।

চাল, ডাল কিংবা মসলাস্তূপে জ্যান্ত কবর দিতে হবে। শাস্তিটা কঠোর হলেও এরকম কিছু জানোয়ার সমাজ থেকে বিতাড়িত হ’লে অনেকগুলো মানুষ বেঁচে যাবে। খুনিরা ভেজাল ব্যবসা ক’রে সমাজে বিত্তবান হবে, আর সাধারন মানুষ উঠতে-বসতে মৃত্যুর সাথে আলিঙ্গন করবে, এটা মেনে নেয়া যায় না।

যারা এধরনের ভেজাল ব্যবসা করছে, তারা জানে না, তাদের কোনো আত্মীয়স্বজনও নিজের অজান্তে তাদের তৈরি প্রোডাক্ট দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যে ব্যক্তি ভেজাল মাস্কের কারবারি, তারও মসলা কিনতে হয়, যে লোক নকল স্যানিটাইজার বিক্রি করে, তারও প্লাস্টিকের চাল কিনতে হয়, এরকম চতুর ব্যবসায়ীরা ভুলে থাকে, ভেজাল ব্যবসার টাকা দিয়ে তারা তাদের স্ত্রী-সন্তানের জন্য যা কিনছে, তাও ভেজাল। মৃত্যু বিক্রি করে প্রকারান্তরে তারা মৃত্যুই কিনে আনছে। হায়রে মানুষ…..!

ক্ষুদ্র একটা জীবনে কতো আয়োজন, কতো লোভ-লালসায় ডুবে থাকা, কতো অন্যায়, কত অত্যাচারের বৃত্তে স্বেচ্ছাবন্দী হবার দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা, আহ! কী অধঃপতন, কী লজ্জা ! হ্যালো, আপনি কি একজন ব্যবসায়ী? যে কোনোভাবেই হোক, অনেক টাকা দরকার আপনার? কয় বস্তা টাকা হলে সুখী হবেন আপনি? টাকার কথা চিন্তা করতে-করতে আপনার ঘুম হারাম হয়ে গেছে? ইশ ! কী কষ্ট আপনার। আপনাকে একটা কথা বলতে খুব ইচ্ছে করছে-

এই যে ভাই, আপনিও কিন্তু একদিন ম’রে যাবেন।

 

লেখকঃ প্লাবন কোরেশী সংস্কৃতিকর্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *