আর্থিক প্রণোদনা কারা, কেন, কীভাবে পাচ্ছেন?

আর্থিক প্রণোদনা কারা কেন কীভাবে পাচ্ছেন
আর্থিক প্রণোদনা কারা কেন কীভাবে পাচ্ছেন

করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এই ক্ষতি কাটাতে ৭২ হাজার কোটি টাকার বেশি আর্থিক প্রণোদনার প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার। মূলত দেশের অর্থনৈতিক খাত যে ক্ষতির শিকার হয়েছে, তা কাটাতেই এই প্রণোদনা প্যাকেজ।

আর্থিক প্রণোদনা কী? কারা পাবেন এই প্রণোদনা? কীভাবে তাদের দেয়া হবে? এবার এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাক…

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আনতে, উৎসাহ যোগাতে, ক্ষতি কাটাতে সহায়তা হিসাবে সরকারের তরফ থেকে যে আর্থিক প্যাকেজ বা বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়, সেটাই আর্থিক প্রণোদনা।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত পাঁচ এপ্রিল করোনাভাইরাসের আর্থিক ক্ষতি কাটাতে ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেন। এর আগেও বিভিন্ন সময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনতে সরকারের তরফ থেকে প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এবারের মতো এতো বড় আকারের প্রণোদনা প্যাকেজ এর আগে আর দেয়া হয়নি।

ঘোষিত প্যাকেজের মধ্যে শিল্প ঋণের জন্য ৩০ হাজার কোটি টাকা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের ২০ হাজার কোটি টাকা, রফতানিমুখী শিল্পের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়।

পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষ ও কৃষকের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা, রফতানি উন্নয়ন ফান্ড ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, প্রিশিপমেন্ট ঋণ পাঁচ হাজার কোটি টাকা, গরিব মানুষের নগদ সহায়তা ৭৬১ কোটি টাকা, অতিরিক্ত ৫০ লাখ পরিবারকে দশ টাকা কেজিতে চাল দেয়ার জন্য ৮৭৫ কোটি টাকা। এছাড়াও করোনাভাইরাস মোকাবিলায় স্বাস্থ্যখাতে বাজেটের অতিরিক্ত ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

কারা পাবেন এই প্রণোদনা

যখন সরকার কোন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে থাকে, তখনই সেখানে প্রণোদনা প্যাকেজটি কাদের জন্য সেটা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়। পরবর্তীতে প্রণোদনা পাওয়ার শর্ত বা পদ্ধতিগুলো ঘোষণা করা হয়ে থাকে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, শিল্প-কারখানার মালিক, কৃষকরা সাধারণত প্রণোদনার মূল লক্ষ্য হয়ে থাকেন। করোনাভাইরাসের ক্ষতি কাটাতে যে প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে, তার বেশিরভাগই ব্যবসায়ীরা পাবেন।

যেমন রফতানিমুখী শিল্পের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য স্বল্প সুদে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। এর ফলে মন্দার সময়েও শিল্প কারখানার মালিকরা অতিরিক্ত চাপ ছাড়াই তাদের কর্মী-শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে পারবেন। প্রথমে শিল্প মালিকরা এটি অফেরতযোগ্য মনে করলেও, পরবর্তীতে জানানো হয় যে, এটি আসলে ঋণ হিসাবে তাদের দেয়া হবে।

আবার মাঝারি-ক্ষুদ্র শিল্পের জন্য যে আর্থিক প্রণোদনা দেয়া হয়েছে, সেটা দিয়ে আর্থিক ক্ষতি সামাল দিতে পারবেন এই ব্যবসায়ীরা। তারা মন্দা কাটিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে পারবেন। এভাবে কৃষক, রফতানি-কারকরা একই রকম সুবিধা পাবেন।

কীভাবে দেয়া হয় প্রণোদনা

সাধারণত ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করেই সরকারি প্রণোদনা দেয়া হয়ে থাকে। করোনাভাইরাসের ক্ষতি কাটাতে যে প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে, সেগুলো পেতে হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যাংকের ওপর নির্ভর করতে হবে। কারণ, সরকার এই প্রণোদনা ঘোষণা করলেও এর বেশিরভাগটা ব্যাংক থেকে ঋণ হিসাবে নিতে হবে। তবে সেই ঋণের সুদের একটি অংশ বহন করবে সরকার।

গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিগুলোর বেতন-ভাতা দেয়ার জন্য সরকার যে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছিল, সেটা সরাসরি সরকার দিয়েছে। কিন্তু বাকি প্রণোদনাগুলোর বেশিরভাগই ব্যাংক নির্ভর। ফলে ঋণ দেয়ার আগে স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, অতীত আর্থিক লেনদেনের ইতিহাস, ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় নেবে।

তবে প্রান্তিক মানুষদের সহায়তায় সরাসরি যে আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়, সেটা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে বা সরাসরি তাদের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়ে থাকে।

সবাই কি এর সুবিধা পাচ্ছেন?

গার্মেন্টস শ্রমিক ও ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশ এই প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর সুবিধা পাচ্ছেন না। সিপিডি’র জরিপ অনুযায়ী, শুধুমাত্র প্রায় ১৫ শতাংশ শ্রমিক তাদের এপ্রিল মাসের পুর্ণাঙ্গ বেতন পেয়েছেন, বাকিরা কেউ আংশিক পেয়েছেন এবং প্রায় ২৫ শতাংশেরও বেশি শ্রমিক হয় অর্ধেকেরও কম বেতন পেয়েছেন কিংবা একেবারে কিছুই পাননি। প্রায় ৬৩ শতাংশ শ্রমিক তাদের বাসাভাড়া পরিশোধ করতে পারেননি।

জুন মাসের ৯ তারিখে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) জরিপে দেখা যায়, এতে অংশগ্রহণকারী প্রায় ৩৫ শতাংশ শ্রমিকদের স্ত্রী বা স্বামী বর্তমানে কর্মহীন অবস্থায় রয়েছেন।

ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ হিসাবে প্রণোদনা দেয়া হলে সেটা সবাই পান না। কারণ, তখন শুধু ব্যবসায়ীর ক্ষতি বা আর্থিক অবস্থার তুলনায় ব্যাংকের নানা শর্ত, বিবেচনা বা সম্পর্ক বেশি গুরুত্ব পায়। কারণ তখন ব্যাংক বিবেচনা করে, গ্রহীতা সেটা ঠিকভাবে ফেরত দিতে পারবে কিনা।

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের গবেষক নাজনীন আহমেদ বলছেন, ‘প্রণোদনার বেশিরভাগ সুফল ভোগ করে যারা ফর্মাল সেক্টরে একটু এগিয়ে রয়েছে এবং যাদের সঙ্গে ব্যাংকের ভালো সম্পর্ক রয়েছে তারা। কিন্তু ক্ষুদ্র ও মাঝারি যে মানুষটা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অনানুষ্ঠানিক খাতে ব্যবসা করছে, ব্যাংকে বেশি লেনদেন নেই, তার জন্য কিন্তু এটা উপকার করে না। শেষ পর্যন্ত ভালনারেবল গোষ্ঠী বেশি সুবিধা পায় না।’

সূত্র: বিবিসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *