আগুনে কি শিল্প পোড়ে: প্লাবন কোরেশী

প্লাবন কোরেশী

বাউলশিল্পী রনেশ ঠাকুরের গানঘরে আগুন জ্বালিয়ে তার বাদ্যযন্ত্রসহ গানের বইসমূহ ছাই ক’রে দিয়েছে কিছু মানুষরূপী পশু। হয়তো অনেকের জানা নেই, শাহ আব্দুল করিমের গানকে কণ্ঠে তুলে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে দেবার পেছনে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছেন বাউল রুহী ঠাকুর ও রনেশ ঠাকুর। এই দু’জন বাউলশিল্পী সম্পর্কে আপন দুই ভাই। বড়ভাই রুহী ঠাকুর মারা যাবার পর রনেশ ঠাকুর ছিলেন শাহ আব্দুল করিমের সেই গুরুত্বপূর্ণ শিষ্য, যিনি খুব কাছ থেকে শাহ আব্দুল করিমকে দেখেছিলেন, তাঁর সঙ্গ পেয়েছিলেন, আর তাঁরই সামনে তাঁর গান কণ্ঠে তুলে নিয়েছিলেন।

                                                                                                      বাউলশিল্পী রনেশ ঠাকুর

আমার ভাবতে ভালো লাগে, এই দু’জন বাউলসাধকের সাথে আমি সরাসরি মিশেছি, চা খেয়েছি, রিক্সায় চড়েছি, হোটেলে আড্ডা দিয়েছি। বলতেই হয়, এই সংযোগ স্থাপনের অন্যতম উৎস হলেন আমাদের প্রিয় গায়ক এবং আমার দীর্ঘদিনের চলার সাথী, বড়ভাই ও ফোকগায়ক ফকির শাহাবুদ্দিন। রুহী ঠাকুর ও রনেশ ঠাকুর সিলেটের দিরাই থেকে ঢাকা এলে ফকির ভাইকে বলতেন কোন্ হোটেলে উঠেছেন, আর ফকির ভাই আমাকে নিয়ে যেতেন তাদের সাথে দেখা করতে। হোটেলে গিয়ে তাদের সাথে গল্প করে বুঝেছি, কতো সরল, কতো শিশুর মতো তাদের মন। তারা যে প্রকৃত শিল্পী, এটা তাদের দেখলে বা তাদের সাথে কথা বললে যে কেউ স্বীকার করবেন। এই দুই ভাইয়ের সাথে ঢাকার রাস্তায় রিক্সা ভ্রমণ করেছি। এক রিক্সায় তিনজন বসলে তারা উপরে বসতে দ্বিধা করতেন না। এখানেই তারা মহান, তারা শিল্পী, তারা খাঁটি মানুষ।

অবাক হলাম, রনেশ ঠাকুরের গানঘর জ্বালিয়ে দেয়া হলো। যারা আগুন দিলো, তারা কী বোঝালো দেশকে? এদেশে গান-বাজনা চলবে না? এটা তো প্রকাশ্যে বলতে হবে। তারা আসুক দলবল নিয়ে প্রেসক্লাবের সামনে। তারা বলুক, এদেশে গান থাকবে না। তারা রায় দিক, এদেশ তাদের বাবার দেশ, আর আমরা শিল্পীরা এখানে বহিরাগত।

গান এদেশের স্বাধীনতার সাথে মিশে আছে। গান মানে বাংলাদেশ, এ সত্যকে অস্বীকার ক’রে তারা আমাদের সকল রাষ্ট্রীয় চ্যানেল, আমাদের সকল শিল্পীদের নিষেধ ক’রে দিক, এদেশে আর গানবাজনা হবে না। কী লজ্জা! এই অন্ধরা জানেই না, রাতের অাঁধারে গানঘর পোড়ালে গান বিলুপ্ত হয় না। গান ঘরে থাকে না, গান থাকে মনে, মননে।

আমি, আমরা গানের বাংলাদেশের সন্তান, আমরা দোয়েল-শ্যামার পাড়ার লোক। আমাদের আছে হাসন, লালন, রাধারমন, আব্দুল আলীম, আব্বাস উদ্দিন, রুহী ঠাকুর আর রনেশ ঠাকুরদের সুরের প্রেরণা। ঘর পুড়িয়ে আমাদের দলভারী করা ছাড়া আর বিশেষ কোনো লাভ হবে না।

প্রশাসন সক্রিয় রয়েছে জেনে শান্তি পাচ্ছি। আমরা চাই অপরাধীদের ন্যায্য বিচার হোক, আর অন্যদের জন্য তা সতর্কবার্তা হোক। আমরা অপরাধীদের গ্রেপ্তারের অপেক্ষায় দিন গুণছি।

সকল উগ্রবাদী, সব অন্ধদের জন্য একটি বাক্য না বললেই নয়, জ্বালিয়ে বা বোমা মেরে কেউ প্রগতিকে রুখতে পারেনি কোনোদিন। এই কথা মনে রেখে চলাই উত্তম কাজ হবে। এটা তো সত্যি, একজন পুড়লে তিনজন বাড়ে।

সর্বশেষ একটি প্রশ্ন করতে চাই সেইসব কুলাঙ্গারদের কাছে- আরে গাধার দল, আগুনে কি শিল্প পোড়ে???

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *